ফরয নামাযের পর সম্মিলিত দোয়া কি বৈধ?

Virtue and significance of Ashura Day
Virtue and significance of Ashura Day

ﻓﻨﺎﺩﻯ ﻣﻨﺎﺩﻱ ﺍﻟﻌﻼﺀ ﻓﺎﺟﺘﻤﻊ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺇﻟﻴﻪ، ﻓﻘﺎﻝ : ﺃﻳﻬﺎ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺃﻟﺴﺘﻢ ﺍﻟﻤﺴﻠﻤﻴﻦ ؟ ﺃﻟﺴﺘﻢ ﻓﻲ ﺳﺒﻴﻞ ﺍﻟﻠﻪ ؟ ﺃﻟﺴﺘﻢ ﺃﻧﺼﺎﺭ ﺍﻟﻠﻪ ؟ ﻗﺎﻟﻮﺍ : ﺑﻠﻰ، ﻗﺎﻝ : ﻓﺄﺑﺸﺮﻭﺍ ﻓﻮﺍﻟﻠﻪ ﻻ ﻳﺨﺬﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻦ ﻛﺎﻥ ﻓﻲ ﻣﺜﻞ ﺣﺎﻟﻜﻢ، ﻭﻧﻮﺩﻱ ﺑﺼﻼﺓ ﺍﻟﺼﺒﺢ ﺣﻴﻦ ﻃﻠﻊ ﺍﻟﻔﺠﺮ ﻓﺼﻠﻰ ﺑﺎﻟﻨﺎﺱ، ﻓﻠﻤﺎ ﻗﻀﻰ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺟﺜﺎ ﻋﻠﻰ ﺭﻛﺒﺘﻴﻪ ﻭﺟﺜﺎ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﻧﺼﺐ ﻓﻲ ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ ﻭﺭﻓﻊ ﻳﺪﻳﻪ ﻭﻓﻌﻞ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻣﺜﻠﻪ ﺣﺘﻰ ﻃﻠﻌﺖ ﺍﻟﺸﻤﺲ
হযরত আলা বিন হাযরামী রা.-এর ঘোষক ঘোষণা করলে লোকজন একত্রিত হলো। অতঃপর তিনি বললেন: হে লোকসকল! তোমরা কি মুসলমান নও? তোমরা কি আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ নও? তোমরা কি আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারী নও? সকলে বললো: হ্যা..। তিনি বললেন: তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর! আল্লাহর কসম, যারা তোমাদের মতো, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা অপদস্ত করবেন না। এরপর ফজরের নামাযের ওয়াক্ত হলে আজান দেয়া হলো। অতঃপর তিনি সকলকে নিয়ে নামায পড়লেন। নামায শেষ করে তিনি হাঁটু গেড়ে (তাশাহহুদের বৈঠকের ন্যায়) বসলেন এবং লোকেরা সকলে হাঁটু গেড়ে বসলো। হযরত আলা বিন হাযরামী রা. হাত তুলে দুআয় মাশগুল হলেন এবং লোকেরাও দুআয় মাশগুল হলো। এভাবে সূর্য ওঠা পর্যন্ত চললো। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৬/৩৬১)
হযরত আলা বিন হাযরমী রা. এবং ও সাথীদের আমল হতে ফরয নামাযের পরে ইজতিমাঈ দুআ প্রমাণিত হয়। আর হাদীসের নীতিমালা অনুযায়ী ইবাদাতের ক্ষেত্রে সাহাবাদের আমল হুকমী মারফু’ অর্থাৎ, রসূলুল্লাহ স. হতে শুনে বা দেখে করেছেন বলে ধরে নেয়া হয়ে থাকে(শরহু নুখবাতিল ফিকার: ৫০-৫১)। তারীখে তাবারীর মধ্যে এ ঘটনার যে সনদ বর্ণনা করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য।
ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻋَﻠِﻲُّ ﺑْﻦُ ﺣُﺠْﺮٍ، ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺇِﺳْﻤَﺎﻋِﻴﻞُ ﺑْﻦُ ﻋَﻴَّﺎﺵٍ، ﺣَﺪَّﺛَﻨِﻲ ﺣَﺒِﻴﺐُ ﺑْﻦُ ﺻَﺎﻟِﺢٍ، ﻋَﻦْ ﻳَﺰِﻳﺪَ ﺑْﻦِ ﺷُﺮَﻳْﺢٍ، ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺣَﻰٍّ ﺍﻟْﻤُﺆَﺫِّﻥِ ﺍﻟْﺤِﻤْﺼِﻲِّ، ﻋَﻦْ ﺛَﻮْﺑَﺎﻥَ، ﻋَﻦْ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗَﺎﻝَ ” ﻻَ ﻳَﺤِﻞُّ ﻻِﻣْﺮِﺉٍ ﺃَﻥْ ﻳَﻨْﻈُﺮَ ﻓِﻲ ﺟَﻮْﻑِ ﺑَﻴْﺖِ ﺍﻣْﺮِﺉٍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺴْﺘَﺄْﺫِﻥَ ﻓَﺈِﻥْ ﻧَﻈَﺮَ ﻓَﻘَﺪْ ﺩَﺧَﻞَ ﻭَﻻَ ﻳَﺆُﻡَّ ﻗَﻮْﻣًﺎ ﻓَﻴَﺨُﺺَّ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﺑِﺪَﻋْﻮَﺓٍ ﺩُﻭﻧَﻬُﻢْ ﻓَﺈِﻥْ ﻓَﻌَﻞَ ﻓَﻘَﺪْ ﺧَﺎﻧَﻬُﻢْ ﻭَﻻَ ﻳَﻘُﻮﻡُ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓِ ﻭَﻫُﻮَ ﺣَﻘِﻦٌ ” . ﻗَﺎﻝَ ﻭَﻓِﻲ ﺍﻟْﺒَﺎﺏِ ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﻭَﺃَﺑِﻲ ﺃُﻣَﺎﻣَﺔَ . ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺑُﻮ ﻋِﻴﺴَﻰ ﺣَﺪِﻳﺚُ ﺛَﻮْﺑَﺎﻥَ ﺣَﺪِﻳﺚٌ ﺣَﺴَﻦٌ
হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন: অনুমতি ব্যতীত কারও ঘরের ভেতর দৃষ্টিপাত করা জায়েয নেই। কেউ যদি কারও ঘরের ভেতর দৃষ্টিপাত করে, তবে তো সে তাতে প্রবেশই করে ফেললো। কোন জনসমষ্টির ইমামতি করে দুআর বেলায় তাদের বাদ দিয়ে কেবল নিজের জন্য দুআ করবে না। এরূপ করলে তাদের সাথে খেয়ানত করা হবে। পেশাব-পায়খানার বেগরুদ্ধ করে কেউ নামাযে দাঁড়াবে না। ইমাম তিরমিজী রহ. বলেন: সাওবান রা.-এর হাদীসটি হাসান এবং এ বিষয়ে হযরত আবু হুরাইরা ও আবু উমামা রা. হতে হাদীস বর্ণিত আছে। (তিরমিজী: ৩৫৭, পৃষ্ঠা: ১/৮২)
এ হাদীসটি মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদীসে মুক্তাদীদেরকে বাদ দিয়ে ইমাম শুধু তাঁর নিজের জন্য দুআ করলে এটাকে রসূলুল্লাহ স. মুক্তিদীদের সাথে খেয়ানত বলে উল্লেখ করেছেন। নামাযের মধ্যে আমরা যে দুআ পড়ে থাকি তার কোনটায় মুক্তাদীদেরকে শরীক করে কোন দুআ নেই। দুই সিজদার মাঝে এবং দুরুদের পরে যে দুআ হাদীসে বর্ণিত আছে তাও কেবল নিজের জন্য। তাহলে এ কথা বলা যেতে পারে যে, খেয়ানত থেকে বাঁচার কোন ব্যবস্থা নামাযে পঠিত দুআগুলোতে নেই। অবশ্য, নামাযের পরের দুআকে হিসেব করলে উক্ত খেয়ানত হতে বাঁচার একটি পথ পাওয়া যেতে পারে। এখন ﻓَﻴَﺨُﺺَّ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﺑِﺪَﻋْﻮَﺓٍ ﺩُﻭﻧَﻬُﻢْ -এর অর্থের ব্যপারে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। ১. শুধু নিজের জন্য দুআ করা, অন্যদের জন্য না করা; ২. অন্যদেরকে সাথে না নিয়ে একা একা দুআ করা। দ্বিতীয় অর্থটি হয়ত নতুন মনে হচ্ছে। তবে উলামায়ে কিরামের খেদমতে আরয, আরবী ইবারতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, এ অর্থটিও হতে পারে কিনা। যদি ইবারতে এ অর্থের সম্ভাবনা না থাকে আমার কিছু বলার নেই। আর যদি সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এটাও ফরয নামাযের পরে ইজতিমাঈ দুআর একটি দলীল হতে পারে।
এভাবে ঈদের সালাতের পরও সম্মিলিত দোয়ার ব্যাপারটিও সহীহ হাদীস দ্বারা সাবেত
ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺃَﺑُﻮ ﻣَﻌْﻤَﺮٍ، ﻗَﺎﻝَ ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻋَﺒْﺪُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺙِ، ﻗَﺎﻝَ ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺃَﻳُّﻮﺏُ، ﻋَﻦْ ﺣَﻔْﺼَﺔَ ﺑِﻨْﺖِ ﺳِﻴﺮِﻳﻦَ، ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻛُﻨَّﺎ ﻧَﻤْﻨَﻊُ ﺟَﻮَﺍﺭِﻳَﻨَﺎ ﺃَﻥْ ﻳَﺨْﺮُﺟْﻦَ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻌِﻴﺪِ، ﻓَﺠَﺎﺀَﺕِ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓٌ ﻓَﻨَﺰَﻟَﺖْ ﻗَﺼْﺮَ ﺑَﻨِﻲ ﺧَﻠَﻒٍ ﻓَﺄَﺗَﻴْﺘُﻬَﺎ ﻓَﺤَﺪَّﺛَﺖْ ﺃَﻥَّ ﺯَﻭْﺝَ ﺃُﺧْﺘِﻬَﺎ ﻏَﺰَﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺛِﻨْﺘَﻰْ ﻋَﺸْﺮَﺓَ ﻏَﺰْﻭَﺓً ﻓَﻜَﺎﻧَﺖْ ﺃُﺧْﺘُﻬَﺎ ﻣَﻌَﻪُ ﻓِﻲ ﺳِﺖِّ ﻏَﺰَﻭَﺍﺕٍ . ﻓَﻘَﺎﻟَﺖْ ﻓَﻜُﻨَّﺎ ﻧَﻘُﻮﻡُ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻤَﺮْﺿَﻰ ﻭَﻧُﺪَﺍﻭِﻱ ﺍﻟْﻜَﻠْﻤَﻰ، ﻓَﻘَﺎﻟَﺖْ ﻳَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ، ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺣْﺪَﺍﻧَﺎ ﺑَﺄْﺱٌ ﺇِﺫَﺍ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ ﻟَﻬَﺎ ﺟِﻠْﺒَﺎﺏٌ ﺃَﻥْ ﻻَ ﺗَﺨْﺮُﺝَ ﻓَﻘَﺎﻝَ ” ﻟِﺘُﻠْﺒِﺴْﻬَﺎ ﺻَﺎﺣِﺒَﺘُﻬَﺎ ﻣِﻦْ ﺟِﻠْﺒَﺎﺑِﻬَﺎ ﻓَﻠْﻴَﺸْﻬَﺪْﻥَ ﺍﻟْﺨَﻴْﺮَ ﻭَﺩَﻋْﻮَﺓَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ
হযরত হাফসা বিনতে সীরীন রহ. বলেন: আমরা আমাদের যুবতীদেরকে ঈদের দিন বের হতে বাধা দিতাম। একবার এক মহিলা এসে বনী খলফ-এর ভবনে অবস্থান করলেন। আমি তার নিকটে গেলে তিনি বললেন: তার বোনের স্বামী রসূলুল্লাহ স.-এর সাথে ১২টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন; যার ৬টি যুদ্ধে তার বোনও স্বামীর সাথে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন: আমরা অসুস্থ ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াতাম, আহতদের সেবা করতাম। একবার তিনি বললেন: ইয়া রসূলাল্লাহ! স. যখন আমাদের কারও ওড়না না থাকে তখন সে বের না হলে কি কোন অসুবিধা হবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ স. বললেন: এ অবস্থায় তার বান্ধবী যেন তাকে নিজ ওড়না পরিধান করতে দেয়। অতঃপর তারা কল্যণকর কাজে এবং মুমিনদের দুআয় শরীক হয়। (বুখারী: ৯২৮)
.
এ হাদীসটি মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজী ও নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদীসে বলা হয়েছে: ঋতুমতী মহিলাদেরকে ঈদগাহে গিয়ে মুসলমানদের দুআয় শরীক হতে, যা নামাযের পরে হয়ে থাকে। কেননা ঈদের ময়দানে প্রথম যে কাজটি করা হয়, তাহলো নামায পড়া। আর খুতবা ও দুআ হয় নামাযের পরে। ‘মুসলমানদের দুআয় শরীক হওয়া’ শব্দ হতে সম্মিলিত দুআর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
উপরোল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা নামাযের পরে সাহাবার আমল দ্বারা ফরয নামাযের পরে ইজতিমাঈ দুআ প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং ফরয নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে ইজতিমাঈ দুআকে ভিত্তিহীন বলার কোন সুযোগ নেই। অবশ্য, রসূলুল্লাহ স. বা সাহাবায়ে কিরাম এ আমলটি স্থায়ীভাবে করেছেন মর্মে কোন পরিষ্কার বর্ণনা আমরা হাদীসে খুঁজে পাইনি। তাই হাদীসের মর্মানুসারে ফরয নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে ইজতিমাঈ দুআ মাঝে-মধ্যে ছেড়ে দেয়া উত্তম। যাতে সাধারণ মানুয়ের মধ্যেও এ বুঝ সৃষ্টি হয় যে, এটা নফল পর্যায়ের আমল; সুতরাং করা উত্তম হলেও না করাতে কোন দোষ নেই।
কোন কোন আলিম ফরয নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে ইজতিমাঈ দুআর আমলকে বিদআত বলে থাকেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য আপত্তিগুলো আমি তুলে ধরে এ ব্যাপারে আমাদের বিশ্লেষণ নিচে পেশ করছি।
আপত্তি ১.
ফরয নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে স্থায়ীভাবে ইজতিমাঈ দুআর আমল নির্দিষ্ট কোন হাদীসে হুবহু প্রমাণিত নয়। বরং বিভিন্ন হাদীসকে একত্রিত করে জোড়া দিয়ে তৈরী করা হয়; যা শরীআতের চাহিদা পরিপন্থী।
.
জওয়াব:
কোন আমলের পরিপূর্ণ রূপ নির্দিষ্ট একটা হাদীস বা একটা আয়াতে থাকতে হবে এ দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাতসহ প্রায় সব ইবাদাতের পূর্ণাঙ্গ রূপই কোন একটি হাদীসে আসেনি; একাধিক আয়াত ও হাদীসের সমন্বয়ে তৈরী করা হয়েছে। সুতরাং ফরয নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে ইজতিমাঈ দুআর আমল একই হাদীসে থাকতে হবে এ দাবী সঠিক নয় এবং এটা কোন আমল গ্রহণযোগ্য হওয়া বা না হওয়ার শর্তও নয়।
——————————————–
আপত্তি ২.
নামাযের পরে দুআ একটি নফল কাজ। এটাকে ইলতিযামের (আবশ্যকীয়তার) সাথে করা ঠিক নয়।
.
জওয়াব:
আমরা এর জবাবে বুখারী শরীফে হযরত আলী রা. বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করছি: রসূলুল্লাহ স. হযরত আলী রা.কে শয়নকালীন তাসবীহ শিক্ষা দিলেন, যেটাকে তাসবীহে ফাতেমী বলা হয়। হযরত আলী রা. উক্ত আমলটি ইলতিযাম বা আবশ্যকীয়তার সাথে আঁকড়ে ধরলেন; যার প্রমাণ হলো তিনি বলেছেন: ﺗَﺮَﻛْﺘُﻬَﺎ ﺑَﻌْﺪ ﻓَﻤَﺎ “উক্ত আমলটি আমি অদ্যাবধি ছাড়িনি”। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো: ﻭﻻ ﻟﻴﻠﺔ ﺻﻔﻴﻴﻦ সিফফীনের রাতেও না? তিনি বললেন: ﻭﻻ ﻟﻴﻠﺔ ﺻﻔﻴﻦ “না, ছিফফীনের রাতেও না”। (বুখারী: ৪৯৭১)
মুওয়াত্তা মালেকে বর্ণিত অপর একটি ঊদাহরণ পেশ করছি:
ﻭ ﺣَﺪَّﺛَﻨِﻲ ﻋَﻦْ ﻣَﺎﻟِﻚ ﻋَﻦْ ﺯَﻳْﺪِ ﺑْﻦِ ﺃَﺳْﻠَﻢَ ﻋَﻦْ ﻋَﺎﺋِﺸَﺔَ ﺃَﻧَّﻬَﺎ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﺗُﺼَﻠِّﻲ ﺍﻟﻀُّﺤَﻰ ﺛَﻤَﺎﻧِﻲَ ﺭَﻛَﻌَﺎﺕٍ ﺛُﻢَّ ﺗَﻘُﻮﻝُ ﻟَﻮْ ﻧُﺸِﺮَ ﻟِﻲ ﺃَﺑَﻮَﺍﻱَ ﻣَﺎ ﺗَﺮَﻛْﺘُﻬُﻦَّ হযরত আয়েশা রা. চাশতের নামায আট রাকাত পড়তেন। অতঃপর বলতেন: ﻟَﻮْ ﻧُﺸِﺮَ ﻟِﻲ ﺃَﺑَﻮَﺍﻱَ ﻣَﺎ ﺗَﺮَﻛْﺘُﻬُﻦَّ “আমার পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেয়া হলেও আমি এটা ছাড়ব না”। (মুওয়াত্তা মালেক: ৫৩) এ হাদীসটি সহীহ।
এ হাদীসদু’টির প্রতি লক্ষ্য করুন! রাতে ঘুমানোর সময় তাসবীহ পাঠ নিঃসন্দেহে একটি নফল আমল। অথচ হযরত আলী রা. সেটাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরলেন যে, সাহাবা ও তাবিঈদের মধ্যে সত্তর হাজার শহীদের রক্তে সিক্ত সিফফীন যুদ্ধেও তিনি তা ছাড়েননি। আবার চাশতের নামাযও একটি নফল ইবাদাত। অথচ হযরত আয়েশা রা. কী পরিমাণ মজবুতীর সাথে তা আঁকড়ে ধরলেন! অতএব, ওই সকল সম্মানিত উলামায়ে কিরামের নিকটে আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা; যাঁরা নফল ইবাদাতকে ইলতিযামের সাথে করা ঠিক নয় বলে বর্জনীয় মনে করেন আপনারা হযরত আলী ও আয়েশা রা.-এর উক্ত আমলের ব্যাপারে কী বলবেন?
——————————————–
আপত্তি ৩.
দুআ একটি নফল ইবাদাত। আর নফল ইবাদাতে কোন জামাআত নেই। সুতরাং ফরয নামাযের পরে দুআ হতে পারে; তবে তা জামাআতবদ্ধ তথা সম্মিলিতভাবে নয়।
.
জওয়াব:
রসূলুল্লাহ স. হতে ইজতিমাঈ দুআর প্রমাণ হিসেবে এ অধ্যায়ের প্রথম দিকে বুখারী শরীফ ও অন্যান্য কিতাবের দলীল পেশ করেছি। সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলেই আশা করি এ আপত্তির জওয়াব মিলে যাবে।
——————————————–
আপত্তি ৪.
নামাযের পরে দুআর দায়েমী (নিয়ম বানিয়ে সব সময়) আমল রসূলুল্লাহ স. হতে প্রমাণিত নয়। সুতরাং প্রয়োজনে কখনও কখনও করা যেতে পারে; কিন্তু দায়েমীভাবে করা যাবে না।
.
জওয়াব:
উম্মাত কোন আমলকে দায়েমীভাবে করার জন্য রসূলুল্লাহ স.-এর আমলের দ্বারা উক্ত আমলের দায়েমী হওয়া প্রমাণিত হতে হবে তা জরুরী নয়। এমন অনেক আমল রয়েছে যা রসূলুল্লাহ স. জীবনে মাত্র এক বা দুইবার করেছেন; অথচ তা আমাদের জন্য সুুন্নাত প্রমাণিত হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে ইসতিসকার নামাযই দেখুন! রসূলুল্লাহ স.-এর যুগে অনাবৃষ্টির অবস্থা একাধিকবার ঘটেছে। অথচ তিনি ইসতিসকার নামায পড়েছেন মাত্র একবার। অন্যবার বৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে জুমআর খুতবায় সম্মিলিত দুআ করেছেন; কিন্তু ইসতিসকার নামায পড়েননি। (বুখারী: ৯৭৩, পৃষ্ঠা: ১/১৪০) এতদসত্ত্বেও ইসতিসকার নামায সমগ্র উম্মাতের নিকটে সুন্নাত হিসেবে স্বীকৃত। নমুনা স্বরূপ এখানে একটি মাত্র উধাহরণ পেশ করা হলো। এর আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
——————————————–
আপত্তি ৫.
ফরয নামাযের পরে দুআ করতে গেলে দেরী হবে। আর ফরয নামাযের পরে সুন্নাতের পূর্বে দেরী করা মাকরুহ।
জওয়াব:
এ আপত্তির সাথে ইজতিমাঈ দুআর কোন সম্পর্ক নেই। একাকী দুআ যেটা সর্ব সম্মতিক্রমে স্বীকৃত, সে দুআ করতেও তো সময় লাগে। তখন যে জওয়াব হবে সেই একই জওয়াব ইজতিমাঈ দুআর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
——————————————–
আপত্তি ৬.
সাহাবায়ে কিরাম রা. নামাযের খুটিনাটি বিষয়ও পরিষ্কার করে বয়ান করেছেন। যদি এটা রসূলুল্লাহ স.-এর দায়েমী আমল হতো, তাহলে সাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে ব্যাপক বর্ণনা পাওয়া যেত। অথচ এ ক্ষেত্রে তা হয়নি।
.
জওয়াব:
সম্মিলিত দুআ ছাড়াও নামাযের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে সাহাবায়ে কিরাম হতে যার স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না। যেমন, নামাযে ‘আমীন’ নীরবে বা সরবে বলা কত বড় প্রকাশ্য আমল। অথচ কেবল ওয়াইল বিন হুজর রা. বর্ণিত হাদীস ব্যতীত এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ স.-এর আমল অন্য কোন সাহাবা বর্ণনা করেছেন বলে আমার নজরে পড়েনি। এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যার মধ্য থেকে নমুনা স্বরূপ একটি আমল এখানে পেশ করা হলো। অথচ এসব আমলের ব্যাপারে আমাদের কোন আপত্তি নেই। তবে শুধু সম্মিলিত দুআর বিষয়টা এমন কেন?
উল্লিখিত আপত্তিগুলো ছাড়া আরও আপত্তি থাকতে পারে। তবে আমার জানামতে উল্লেখযোগ্য আর কোন আপত্তি নেই।
——————————————–
এ কথা সর্বজন বিদিত যে, দুআ একটি নফল ইবাদাত। এর জন্য কোন সুনির্ধারিত সময় নেই। তবে দুআ কবুল হওয়ার কিছু খাছ সময়ের কথা হাদীসে বর্ণিত আছে। আর কিছু খাছ আদবের কথাও বর্ণিত আছে যা দুআ কবুলের জন্য সহায়ক। সেসব খাছ সময়ের মধ্যে একটি হলো ফরয নামাযের পর। (তিরমিজী: ৩৪৯৯) আর আদব সমূহের মধ্যে রয়েছে হাত উত্তোলন করা। (আবু দাউদ: ১৪৮৬) ইজতিমাঈ দুআ যদিও দুআর কোন আদব নয়; তবে একত্রে অনেক মানুষের দুআ আল্লাহ তাআলার নিকটে অধিক পছন্দনীয়। (মুসতাদরাকে হাকেম: ১৮৩১) আর বুখারী শরীফের ৯৭৩ নম্বর হাদীসও এর প্রতি ইঙ্গিত করে নামাযের পরে হাত উত্তোলন করে সম্মিলিত দুআ করা এ নিয়মের বাইরে নয়। উপরন্তু, হযরত আলা বিন হাযরমী রা.-এর আমল (আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৬/৩৬১) দ্বারা এর গ্রহণযোগ্যতা পূর্ণতায় পৌঁছেছে। এসব কিছুর পরও এটাকে বিদআত বলার কারণ কী, তা আমার বোধগম্য নয়। বিদআত তো এমন বিষয়কে বলা হয়, যার কোন ভিত্তি ﺧﻴﺮ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ -এ পাওয়া যায় না। ফরয নামাযের পরে সম্মিলিত দুআর কোন ভিত্তিও কি অনুরূপ? তাহলে আলা বিন হাযরমীর আমলটি কোন যুগের?
বর্তমান দেখা যায়, ফজর ও আসরের নামাযের পরে প্রায় অর্ধেক মুসল্লী মুনাজাতের পূর্বেই উঠে যায়। ইজতিমাঈ দুআকে বিদআত বলার পরিণামে একাকী দুআর সুুন্নাতও ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে। তারপরেও মুনাজাতকে ‘জনসাধারণ জরুরী মনে করে তাই ছেড়ে দেয়া উচিত’ বলে আমরা নতুন করে আর কোন প্রমাণের অপেক্ষায় আছি? কুরআন-হাদীসের মূলনীতির আলোকে যেটা জায়েয হয় এবং সাহাবার আমল দ্বারা সমর্থিত হয় স্পষ্ট কোন দলীল ব্যতীত সেটাকে বিদআত বলে প্রত্যাখ্যান করায় দ্বীনের স্বার্থ রক্ষা হবে কি? বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে আশা করছি।

মুফতি: ইকরাম বিন আযীয