হাদিসের গল্পঃ পরিণতি

হাদিসের গল্প

মরুর আকাশ ঝকঝক করে উঠছে৷ পসরা বসছে অপার্থিব জ্যোতির৷ আসছে মানব ও মানবতার ঐক্য,সংহতি ও সৌহার্দ্যের মাহিন্দ্রক্ষণ৷
এইতো আর কয়েকটা দিন ৷ এর পরই পবিত্র হজ্বের মওসুম৷প্রভু ও বান্দার মিলন মেলা৷ মনিব ও গোলামের প্রেম-ভালবাসায় মুখর হয়ে উঠবে ধরণী৷ সৃষ্টি ও স্রষ্টার গোপন অভিসারে পুলকিত হবে পৃথিবী৷মালিক ও মালির নিকটে আসার অকৃত্রিম সে দৃশ্যে অবগাহন করবে জগত সংসার৷
সকল পঙিলতা ধুয়ে-মুছে সজীবতা সজীবতায় ভরে উঠবে সৃষ্টি কুল৷তাইতো মরুবালি আনন্দ নৃত্যে মেতে উঠেছে৷ বেলাভূমির আলো ঝিকিমিকি যেন সে বার্তায় দিচ্ছে৷ প্রকৃতিতে লেগেছে আনন্দের হাওয়া৷ মৃদুসুখ সমীরণ দোলায় হেলছে-দুলছে লতা-গুল্ম,পল্লব৷কানায় কানায় ভরে উঠছে পবিত্র মক্কা নগরী৷ধীরে ধীরে লোক সমাগম বাড়ছে৷ হজ্জের মূল পর্ব এখনও শুরু হয়নি৷ হলে উছলে পড়বে মানব ঢল৷৷মানুষ ছুটে আসছে৷ এক নজর কাবা জেয়ারতের প্রত্যাশা বুকে নিয়ে৷

তারা চক্ষু জুড়াবে কাবা দেখে দেখে৷
হৃদয় সিক্ত করবে মালিকের সান্বিধ্য পেয়ে পেয়ে৷
মন ভরাবে তওয়াফে তওয়াফে৷
চক্ষু ভেজাবে কেঁদে-কেঁদে৷
চুমোয় চুমোয় ভরে তুলবে হাজরে আসওয়াদ৷
তাই তো প্রভু ভক্ত বনী আদমের ঢল নেমেছে মক্কা অভিমুখে৷শত কষ্ট-ক্লেশ হাসি মুখে মেনে নিয়ে৷ প্রভুর ঘর জেয়ারতে ছুটে আসছে৷ কোন বাধাই তাদের কাছে বাধা নয়৷ মরুর প্রলয়ংকারী ঝড়,গ্রীষ্মের অনলবর্ষী রোদ,উত্তপ্ত বালুর অগ্নিউদ্গীরণ কোনটাই দূর্লঙ নয়৷

চলছে সলা-পরামর্শ৷লিডারদের গোপন পরামর্শ কক্ষে সবার কপালে ভাঁজ-রেখা৷ কিভাবে সমাধান হবে তাদের সমস্যার তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ৷ কেউ কেউ অধর চিবোচ্ছে কুল কিনারা না পেয়ে৷ একজন একটা কৌশল বের করছে তো অন্যজন তা প্রত্যাখান করে দিচ্ছে নেতিবাচকদিকগুলো তুলে ধরে ৷ এভাবে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো৷ আর কতো কালক্ষেপণ! কিছু তো একটা করতে হবে! নতুবা সর্বনাশ হয়ে যাবে!মান যাবে৷ সম্মান হারাবে৷ শুধু আরব মূলক নয়,বরং গোটা জগদ্বাসী জেনে যাবে,কাবার সেবকরা তাদের বাপ দাদার ধর্ম রক্ষা করতে পারেনি! তারা এক এতিমের নবোদ্ভাবিত ধর্মের কাছে পূর্বপুরুষদের ধর্মকে জলান্জলি দিয়েছে৷ এ অপমান সইবে কী করে মক্কাবাসী! এক বিন্দু রক্ত অবধি তারা সম্মান বাঁচানোর লড়াই করে যাবে৷যেভাবেই হোক
ঠেকাতে হবে মুহাম্মাদকে সা:! ঠেকাতে হবে তাঁর ধর্মকে! ঠেকাতে হবে তার মতাদর্শকে!
এতে রক্ত গঙা বয়ে দিতে প্রস্তুত মক্কার গোত্র-প্রধানরা৷
কিন্তু প্রতিহত করবে কিভাবে এ নতুন দ্বীন প্রচারককে৷ বিশেষ করে হজ্জের মওসুমে তো তাঁকে কোন রকমই সুযোগ দেওয়া যায় না! এ যে আত্মঘাতী হয়ে যাবে৷ তার ঐশী শক্তির কাছে আগত হাজিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে৷ মানুষ মুহাম্মদের দ্বীনকেই সঠিক বলে মেনে নেবে৷ তাঁর সুমধুর বাচন ও সু কৌশলী যুক্তিতে মানুষ মুগ্ধ না হয়ে পারবে না৷ সুতরাং যেভাবেই হোক ঠেকাতে হবে মুহাম্মাদকে সা৷

সবাই যখন পেরেশানীর ষোলকলা পূর্ণ করছে তখন ওয়ালিদের মুখে ক্রুর হাসি৷ কূটবুদ্ধিতে পটু
এ নরাধম নিজের জাত চেনানোর প্রতিক্ষায় ৷সুযোগ বুঝে দুষ্ট ওয়ালিদ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার প্রতারণাপূর্ণ মত পেশ করলো৷ মুহূর্তে পরিবর্তন হয়ে গেলো পরিবেশ৷ কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছিলো নিকোষ মেঘাড়ম্বর,নিমেষেই তা উধাও৷সকলেই শস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো৷ সহাস্য বদনে ওয়ালিদের মত গ্রহণ পূর্বক হাসি মুখে সলা কক্ষ ত্যাগ করলো গোত্রপতিরা৷
নেতা গোছের ওয়ালিদও ঝুলিয়ে দিলো এক গাল বিজয়ের হাসি৷ এখন শুধু সময়ের প্রতিক্ষা৷

হাঁ,এটা ইসলামের শুরুলগ্ন৷ সবে ইসলামের রক্তিম রবি উঁকি মারছে পূর্ব দিগন্তে৷কালোর চাদর চিরে আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে জগত৷ সকল আঁধার কেটে আগমন করছে অপার্থিব জ্যোতি দ্বীনে মুহাম্মাদ সা৷
ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাচ্ছেন মহা নবী হযরত সাঃ৷ এতোটুকু ফুরসত নেই হাতে৷ সর্বদাই তিনি দ্বীন প্রচারে ব্যাস্ত৷কোন বাধা তাকে বিরত রাখতে পারেনি৷ শত প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে তিনি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর মিশন অব্যহত রেখেছেন৷
সামনে জিলহজ্জ মাস৷ সারা দুনিয়া থেকে মানুষ জড়ো হবে মক্কা নগরীতে৷ এমন সুযোগ হাত ছাড়া করার কোন ইচ্ছে নেই৷ এটা দাওয়াতের ভরা মওসুম৷
আল্লার বান্দাদের কাছে তার দ্বীন পৌঁছানোর এটাই মোক্ষম সময়৷ স্রষ্টার সাথে বান্দাকে জোড়ানোর এ সুযোগ যখন হাতের নাগালে তখন ই বাধ সাধলো মক্কার কাফেররা৷
তারা ওয়ালিদের দেওয়া কৌশল প্রয়োগ করলো৷
মক্কা প্রবেশের চার গিরিপথে বসিয়ে রাখলো ষোলজন ব্যাক্তিকে৷ যারা লাগাতার রাসুল সা এর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাতে লাগলো৷ আগত হাজিদের সামনে রাসুলকে সাঃ দেখিয়ে বলতে লাগলো এ লোকটি(নাউযুবিল্লাহ) যাদুকর,পাগল,অতিন্দ্রীয়বাদী,কবি ইত্যাদি৷ মানুষকে রাসুল সাঃ এর কাছে ঘেঁষতে নিষেধ করতে লাগলো এই বলে যে,‘সে একজন যাদুকর,পাগল,সে তার যাদুর মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়৷ দূরুত্ব সৃষ্টি করে পিতা-পুত্রের মাঝে আরো নানান অযুহাতে তারা মানুষকে রাসুল সা থেকে দূরে রাখছিলো৷
আর এই অপপ্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো অভিশপ্ত ওয়ালিদ বিন মুগিরা৷
এতে রাসুল সাঃ ভীষণ কষ্ট পেলেন৷ তার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেলো৷ দু‘চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো৷ একে তো দ্বীন প্রচার করতে দিলো না,তার উপর সকলের কাছে তাকে পাগল যাদুকর বলে প্রচার করলো৷ তিনি ব্যাথিত হলেন কিন্তু
অভিযোগহীন চিত্তে নীরবে সয়ে গেলেন৷ বদদোয়াও করলেন না৷ বুকের ব্যথা বুকেই চেপে রাখলেন৷

বেদনাক্লিষ্ট রাসুল সাঃ হাতিমে উপবিষ্ট৷ উম্মতের ফিকরে মগ্ন৷ পথভোলা বনী আদমের পরিণাম চিন্তা করে তাদেরকে সঠিক পথে ফেরানো ফিকর করছেন৷ এমন মুহূর্তে হযরত জিব্রাইল আ আগমন করে রাসুল সা কে সালাম পেশ করলেন৷ এদিকে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা হাতিমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো৷ জিবরাঈল আ রাসুল সা কে বললেন,‘এই লোকটিকে আপনি কেমন পেয়েছেন?
প্রতিউত্তরে রাসুল সা বললেন,সে তো আল্লাহর নিকৃষ্ট এক বান্দা৷
সাথে সাথে জিবরীল আমিন স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে তার পায়ের গোছার উপরি ভাগে ইশারা করে বললেন,তার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে৷৷

ওয়লিদ বিন মুগিরা ডোরাকাটা সুন্দর দুটি চাদর পরে খুব দম্ভ ভরে যাচ্ছিলো৷ খোযায়া বংশের শাখা-গোত্র বনি মুস্তালিকের প্রাচীরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার লুঙিতে একটা শর বিঁধে যায়৷কিন্তু তার ছিল প্রকট দাম্ভিকতা৷ অপরিমিয় অহংবোধ৷ বিধায় তীরটা খসানোকে আত্মমর্যাদাহুতি ভেবে সে অবস্থাতেই চলতে লাগলো৷পরিণতিতে তীরাগ্র জিবরাইলের চিন্হিত স্থানে বিদ্ধ হয়৷এবং যন্ত্রণায় ছটপট করতে করতে পটল তুলতে যায়৷

এর পর হযরত জিব্রাইল(আ) আস বিন ওয়ালকে অতিক্রম করতে দেখে জিজ্ঞাসা করেন,
হে আল্লাহর রসুল এ লোকটির ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
রাসুল সা বললেন,সে তো ভীষণ বদ লোক৷
এবার জীবরাঈল স্বীয় হস্ত দ্বারা আস বিন ওয়েলের পদতলে আলতো আঘাত করে বললেন তার জন্য যথেষ্ট হয়েছে৷

আস বিন ওয়ায়েল তায়েফে যাওয়ার জন্য একটি গাধা প্রস্তুত করে এবং সে গাধার পিঠে উঠে রওয়ানা দেয়,কিন্তু শেষ অবধি যাওয়া সম্ভব হয়নি৷ গাধা তাকে পিঠ থেকে আচড়ে জমিনে ফেলে দেয়৷ গাধার পিঠ থেকে সোজা কাঁটার ঝোপে পড়ে তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হয়৷এবং সে যন্ত্রণা তাকে অস্থির করে তুলে৷ পরিণতিতে যন্ত্রণা দায়ক মৃত্যূ৷

হারিস বিন কায়েস৷ তাকে দেখে জিবরাঈল বলেন,এই লোকটাকে কেমন পেয়েছেন?
রাসুল সাঃ বললেন,সে তো বদের হাড্ডি৷
জিবরাইল আ কাল বিলম্ব না করে স্বীয় হস্ত দ্বারা তার মাথার দিকে ইশারা করেন৷
পরবর্তীতে হারিসের মাথায় একটি বিষ ফোড়া উঠে৷পরিণতিতে বেদনাদয়ক মৃত্যূ৷

আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুস৷ তার ব্যাপারেও পূর্বোক্ত প্রশ্ন করেন জিবরাঈল আ৷
রাসুল সা এর উত্তরও ছিলো পূর্বের ন্যায়৷
এবার জিবরাঈল তার পেটের দিকে ইশারা করেন৷
এরপর সে প্রচন্ড পিপাসিত হয়৷ পরিণতিতে তৃজ্ঞাকাতর হয়ে যখন পানি পান করতে যাবে অমনি কষ্টদায়ক মৃত্যূকে আলিঙন করে৷

সর্বশেষ আসওয়াদ বিন আব্দুল মুত্তালিবের দিকে ইশারা করে পূর্বের মতো প্রশ্ন করলে রাসুল সা একই উত্তর দেন৷
তখন জিবরাইল আ তার চেহারায় পাথর দ্বারা আঘাত করেন৷ পরিণতিতে সে অন্ধ হয়ে দুঃখ জনক,হতাশাব্যন্জক অবস্থায় মৃত্যূকে অক্কা পায়৷
আর পরকালিন শাস্তি তো রয়েছেই৷

এভাবেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর দ্বীনের শত্রুদের নিশ্চিন্হ করে দেন৷স্বীয় দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেন কুফফার শক্তিকে চূর্ণ করে৷সুতরাং কাফেরদের বাহ্য শক্তি দেখে ভয় পাওয়া মুসলমানদের জন্য একেবারেই যায় না৷ মুসলমানদের বিজয় তো অবশ্যম্ভাবী৷ প্রয়োজন শুধু ঈমানী বলে বলিয়ান হওয়া৷
নবীজি সা এর শিক্ষা,সাহাবায়েকেরামের আদর্শ ও পূর্ববর্তী মনীষীদের পদাঙ অনুসরণ করলে আবারও বিশ্ব নেতৃত্ব মুসলমানদের করতলে চলে আসবে৷ আবারও শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে এ জগতে৷ হেসে উঠবে মানব ও মানবতা৷

লেখকঃ মুফতি মু‘তাসিম বিল্লাহ