মুহাররম মাসঃ করণীয় ও বর্জনীয়

মুহাররম মাস করণীয় ও বর্জনীয়
মুহাররম মাস করণীয় ও বর্জনীয়

ইসলামী শিক্ষা ও জীবনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল, সহজ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম উম্মাহের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক ভিন্নতা। সহজ ও স্বাভাবিকতার পরিবর্তে বিলাসবহুল ও লোক দেখানো লাইফ স্টাইল। সামাজিকতার পর্ব-উৎসব, জীবনাচার সবকিছুতেই অধিকাংশ মুসলমানের জীবন আনুষ্ঠানিকতাবহুল হয়ে পড়েছে। সহজ সরল জীবন-যাত্রা, যা ছিল ইসলামের শিক্ষা এবং উম্মাহর পূর্বসূরী কর্মবীরগণের বৈশিষ্ট্য, তা এখন অনেকটাই বিদায় নিয়েছে। এখন জীবন জুড়ে অনুষ্ঠানের ঘনঘটা। এ সকল অপ্রয়োজনীয় ও স্ব-আয়োজিত বিভিন্ন উৎসবের ব্যস্ততায় মানবজীবন এতই ব্যস্ততায় ভরে গেছে, প্রয়োজনীয় কাজের ইচ্ছে ও সুযোগ কমে এসেছে। এই আরোপিত আনুষ্ঠানিকতা শুধু সাধারণ জীবনযাত্রাকেই নয়, আমল-ইবাদতকেও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। এমন অনেক বিষয়কে মানুষ পুণ্যের কাজ বানিয়ে নিয়েছে যেগুলোর সাথে শরীয়তের নির্দেশনার কোনো সম্পর্ক নেই। শরীয়তের বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডকে ইসলামের ফ্লেভার মিশিয়ে জীবনের গড়পড়তায় শামিল করা হচ্ছে। শরীয়তের পরিভাষায় যা ‘বিদআত’ হিসাবে চিহ্নিত।

 কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে এ মাসের যে বর্ণনা এসেছে, তা থেকে প্রতীয়মান যে, এটা খুব ফযীলতপুর্ণ মাস। কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম।

এ মাসে রোযা রাখার গুরুত্ব অনেক। তাই রোযা রাখার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। 
হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ।’

أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم

-সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭

এর মধ্যে আশুরার রোযার ফযীলত আরও বেশি।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’

ما رأيت النبي صلى الله عليه وسلم  يتحرى صيام يوم فضله على غيره إلا هذا اليوم يوم عاشوراء وهذا الشهر يعني رمضان

-সহীহ বুখারী ১/২১৮

হযরত আলী রা.কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপসি’ত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’-জামে তিরমিযী ১/১৫৭

অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’

صيام يوم عاشوراء أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله

-সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮

আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদীসে আছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’

صوموا عاشوراء وخالفوا فيهاليهود، صوموا قبله يوما أو بعده يوما

-মুসনাদে আহমদ ১/২৪১

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯

মহররম ও আশুরা কেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার আমাদের দেশে প্রচলিত। যা সম্পুর্ণ শরীয়ত পরিপন্থী।

এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন।-সহীহ বুখারী ১/৪৮১

তবে এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন। যেমন, এদিন হযরত ইউসুফ আ. জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইয়াকুব আ. চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইদরীস আ.কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলে, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই।-আল আসারুল মারফূআ, আবদুল হাই লাখনেবী ৬৪-১০০; মা ছাবাহা বিসসুন্নাহ ফী আয়্যামিস সানাহ ২৫৩-২৫৭

এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা.। বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা-‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’

অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপরায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।’

অতএব শাহাদাতে হুসাইন রা.কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রীতি নীতি থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।এর দ্বারা ঈমান ধবংস হয়ে যেতে পারে,আবেশির জোরে শিরকি হয়ে যেতে পারে।

আশুরা, মহররম

এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রীতি নীতির  কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়।

এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধ্যান  ধারণা ও কুসংস্কার।

মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো যথা , তওবা-  ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী কীবন পরিচালনা করা মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।