তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য সহায়ক কিছু আমল

 

মূল:ড,আয়েয আল করনী

কিয়ামে লাইল৷ এটি সুন্নাতে নববী৷ সাধারণ কোন সুন্নাহ নয়,বরং অনন্য সাধারণ একটি সুন্নাহ৷ এ সুন্নাহকে শিয়ারে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকও বলা হয়ে থাকে৷ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসল্লাম নিয়মিত কিয়ামে লাইল তথা তাহাজ্জুদ পড়তেন৷ সাহাবায়েকেরামকে পড়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন৷ উম্মাহকেও তাহাজ্জুদের ব্যাপারে যত্নবান হতে বলেছেন৷ মুসলমানদের উচিত মৃতপ্রায় এ সুন্নাহটিকে বাঁচিয়ে রাখা৷ এর গোড়ায় অশ্রু ঢেলে ঢেলে এটিকে সজিব রাখা৷ বিশেষত ওয়ারিছিনে আম্বিয়াদের জন্য এবিষয়ে ঢিলেমি করার কোন সুযোগ নেই৷ তাদের জন্য এব্যাপারে শৈথল্য প্রদর্শন করা অনুচিত ও বেমানান৷ তাহাজ্জুদকে আকড়ে ধরতে হবে৷ এটি মুসলমানদের পৈতৃক সম্পত্তি৷ অমূল্য সম্পদ৷
তাহাজ্জুদ নামক এ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহটি যখন থেকে ছেড়ে দিয়েছি তখন থেকে আমরা ঈমানের স্বাদ ও উষ্ণতা হারিয়েছি৷
আমাদের জীবন থেকে যখন এ আমলটি বের হয়ে গেছে তখন থেকে আমরা ভুলে গেছি জীবনের অর্থ৷ গোল বাধিয়েছি জীবনের হিসেব-নিকেষে৷জীবন প্রবাহের স্বাভাবিক স্রোত ও আবহ থেকে ছিটকে পড়েছি৷
আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে এ সুন্নাহটি বিদায় নেওয়ার সাথে সাথে আমাদের থেকে আল্লাহর অপার দান সম্মান,শ্রেষ্ঠত্ব ও সাহায্যটুকু বিদায় নিয়েছে৷
আজ আমাদের অবস্থা পরিদৃষ্টে তাই মনে হয়৷ একদিকে আমরা আসমানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি অন্যদিকে জাগতিক উপকরণেও পিছিয়ে পড়েছি৷ এ মুহূর্ত আল্লাহর প্রতি অধিক পরিমাণ ধাবিত হওয়া ব্যতীত অন্য কোন পথ খোলা নেই৷ আল্লাহর কাছে প্রার্থনার ও নিজের আর্জিটুকু পেশ করার সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষপ্রহর৷
হযরত উলামায়েকেরামগণ স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে কিয়ামে লাইল তথা তাহাজ্জুদে অভ্যাস্ত হওয়ার ব্যাপারে কিছু উপদেশ দিয়ে থাকেন৷

১। গোনাহ পরিত্যাগ করা৷ বিশেষ করে দিনের বেলা যারা বিভিন্ন গোনাহের কাজে মাশগুল থাকে৷ শরিয়ত পরিপন্থী কর্মে লিপ্ত থাকে,তাদের জন্য কিয়ামে লাইল অনেক কঠিন৷ সুতরাং কিয়ামে লাইলের যওক-শওক,মুহাব্বত ও ভালবাসা যাদের হৃদয়ে আছে এবং যারা শেষ রাতে উঠে মহান রবের সাথে বিশেষ মোলাকাত করতে ও মিনতি পেশ করতে আগ্রহী তাদের অবশ্য কর্তব্য হলো দিনভর কোন ধরনের গোনাহের কাজে নিজেকে না জড়ানো৷
এক ব্যাক্তি হযরত হাসান বসরি রহ:কে বললেন,
হে আবু সাঈদ,হৃদয়ে অনেক যওক -শওক থাকা সত্বেও তাহাজ্জুদের সময় উঠতে পারিনা৷ঘুমের অতলে হারিয়ে যায় আমার তাহাজ্জুদ পড়ার সব আগ্রহ,অভিলাষ৷
দয়া করে বলুন,এর কারণ ও প্রতিকার কী?
উত্তরে হাসান বসরী রহঃ বললেন,গোনাহ ত্যাগ করো৷কাবার রবের শপথ, তোমার গোনাহই তোমাকে তাহাজ্জুদ পড়া থেকে বিরত রেখেছে৷ সুতরাং সত্যিই যদি তুমি কিয়ামে লাইলে আগ্রহী হয়ে থাকো তবে গোনাহ ছেড়ে দাও৷

২। নিয়মিত তাসবিহাতে ফাতেমীর আমল করা৷অর্থাৎ পাঁচওয়াক্ত নামাযান্তে
৩৩বার সুবহানাল্লাহ৷
৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ৷
এবং৩৪বার আল্লাহু আকবার পড়া৷
এ আমলটি অব্যাহত রাখলে ইনশাল্লাহ তাহাজ্জুদে অভ্যাস্ত হতে সহায়ক হবে৷

৩। বিনা প্রয়োজনে রাত্রীজাগরণ না করা৷ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসল্লাম ইশার পর গল্প-গুজব ও অনর্থক কাজে-কর্মে সময় অতিবাহিত করতে নিষেধ করেছেন৷ এমনিতেই অনর্থক কাজ -কর্ম ও গল্প-গুজব নিষেধ,আর ইশার পর এটি আরো মারাত্মক৷কারণ এর দ্বারা শেষ রাতে ওঠা অনেক কঠিন হয়ে যায়৷ কখনও তো ফজরের জামাতও ছুটে যায়৷ আর যদি নামায কাযা হয়ে যায় তাহলে তো আরো দুঃখজনক৷এই জন্য ইশার পর প্রয়োজন ছাড়া জেগে না থাকা৷

কিন্তু বর্তমান তো আমাদের অবস্থা এমন,নাটক,সেনেমা,সিরায়ল ও খেলা দেখার জন্য অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি৷ আর ইবাদাতের জন্য সমান্যও কষ্ট করতে বা ঘুম বির্জন দিতে আগ্রহী না৷কী পরিমাণ গোনাহ হচ্ছে এর দ্বারা একটুও কি ভেবেছি আমরা? একজন মানুষ যখন রাত ১২/১পর্যন্ত এ সমস্ত গোনাহের কাজে লিপ্ত থাকবে তখন তার জন্য শেষ রজনীতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া কি সম্ভব৷
হাঁ,কেউ যদি ইলম চর্চা বা অতিপ্রয়োজনে রাত জাগে তাহলে ভিন্ন কথা৷ এ ক্ষেত্রও করণীয় হলো নিয়মিত যেন তাহাজ্জুদ ছুটে না যায় সে দিকে লক্ষ রাখা৷ যারা দ্বীনি ইলম চর্চার জন্য রাত্রীজাগরণ করে তাদের জন্য তো সর্বোত্তম সময় হলো শেষ রজনী৷ এ মুহূর্তে আল্লাহর কাছে যে পরিমাণ মিনতি পেশ করতে পারবো যে পরিমাণ ইলম আহরণ করতে পারবো তা হয়তো শুরু রজনী থেকে বেশি হবে৷ তাই শেষ রাতে জাগ্রত হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে৷
বর্তমান আমাদের সমাজে অনেক মানুষ রাত জেগে জেগে ওয়াজ শুনে এদিকে ফজরের নামায কাযা করে ফেলে৷ (লাহাওলা ওয়ালাকুয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ৷) ওয়াজ শোনা ভালো কাজ৷ ক্ষেত্র বিশেষ তা জরুরীও বটে, তবে মনে রাখতে হবে এর কারণে যেন নামায কাযা না হয়৷জামাত যেন ছুটে না যায়৷

৪। কায়লুলা করা৷ দুপুরে আহারপূর্বক কিছু সময় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়াকে কায়লুলা বলে৷এটি সুন্নাতে নববী৷ এই সুন্নাহটিও ইনশাল্লাহ শেষ রাতে উঠে মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে৷

আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন৷

ভাষান্তর:মুফতি মু‘তাসিম বিল্লাহ