ইন্টারনেটে গোপন গুনাহের পরিণতি

প্রতি রাতে এক তরুণ নির্জন রুমে শুয়ে শুয়ে মোবাইলে এক তরুণীর সাথে কথা বলে। তার বাবা-মা পাশের রুমে ঘুমিয়ে থাকেন। তারা ঘুণাক্ষরেও টের পান না তাদের প্রিয় সন্তান জড়িয়ে পড়েছে কোন এক অনাকাঙ্খিত সম্পর্কে। এটি কাল্পনিক কোন দৃশ্য নয়, আজকের সমাজের অনেক ঘরের দুঃখজনক বাস্তবতা।

আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও বাবা—মায়েরা তাদের সন্তানকে বাইরে বেরোতে দিতে ভয় পেতেন। তারা ভাবতেন, সন্তান ঘরেই নিরাপদ, বাইরে বেশি সময় কাটালে তার চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু কালের আবর্তনে, সময়ের বিবর্তনে এ কনসেপ্ট ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নিজের পার্সোনাল রুমে একটি স্মার্টফোন ডিভাইস ও ইন্টারনেট কানেকশনের মাধ্যমেই মানুষের চরিত্র শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক তরুণ নির্জনে রাতের পর রাত ইন্টারনেটে কি ধরনের অশ্লীল ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু রাত হোক বা দিন হোক আল্লাহ তায়ালাকে কখনোই ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। কোরআনে হাকিম বলছে, يستخفون من الناس ولا يستخفون من الله وهو معهم إذ يبيتون مالا يرضى من القول তারা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে চায়, আর আল্লাহর কাছ থেকে লুকাতে চায় না। অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে প্রতি মুহূর্তে আমাদের ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা হচ্ছে, বিশেষ করে নির্জনে যখন আমরা মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছি তখন আমাদের তাকওয়া ও খোদাভীতি প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। একটি ক্লিক আমাদের জান্নাতের রাস্তা থেকে জাহান্নামের দরজায় নিয়ে যাচ্ছে, মাত্র দু’ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ আমাদের আলোর জগত থেকে অন্ধকার জগতে ঠেলে দিচ্ছে । নির্জনে ইন্টারনেট ব্যবহার করার পর আমরা তাৎক্ষণিক সার্চ হিস্ট্রি বা ওয়াচ হিস্ট্রি ডিলিট করে দেই এ ভয়ে যে, কেউ দেখে ফেললে যদি আমাদের ক্লিন ইমেজ নষ্ট হয়ে যায় । অপরাধ করার সময় আমাদের রুমের পর্দা যদি বাতাসে সামান্য নড়ে ওঠে আমাদের অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে, হায় এই বুঝি আর কেউ এসে গেল আর আমি অপমানিত হয়ে গেলাম। অথচ আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলার এই বাণী আমরা ভুলে গিয়েছি,

اليوم نختم على افواههم وتكلمنا ايديهم وتشهد ارجلهم ما كانوا يكسبون আমার চোখ আমার হাত-পা সব আমার বিরুদ্ধে একদিন সাক্ষী দেবে ,আমরা মানুষের সামনে লাঞ্চিত হতে ভয় পাচ্ছি, কিন্তু একথা চিন্তা করছি না, গোপন গুনাহের কারণে কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সামনে ও সমগ্র বিশ্বের সামনেও হয়তো লাঞ্চিত হতে পারি।

সুনানে ইবনে মাজার ৪২৪৫ নং হাদিস, বিশুদ্ধ সূত্রে সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন— ‏”‏ لأَعْلَمَنَّ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيضًا فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَبَاءً مَنْثُورًا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ ثَوْبَانُ ‏:‏ يَا رَسُولَ اللَّهِ صِفْهُمْ لَنَا جَلِّهِمْ لَنَا أَنْ لاَ نَكُونَ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لاَ نَعْلَمُ ‏.‏ قَالَ ‏:‏ ‏”‏ أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ وَيَأْخُذُونَ مِنَ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُونَ وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا ‏”‏ ‏.‏

আমি আমার উম্মাতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি যারা কিয়ামতের দ্বীন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমল সহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের পরিচয় পরিস্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেনঃ তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে।

প্রিয় বন্ধু! যদি কিয়ামতের কঠিন সময়ে আল্লাহ আমাদের নামাজ-রোজা আর কষ্টে অর্জিত ছাওয়াবকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেন তখন আমাদের চাইতে অসহায় আর কে হবে! আমাদের চাইতে দুর্ভাগা কে হবে সেদিন, যেদিন রাব্বে কারিম বলবেন, মানুষের সামনে তুমি নামাজ পড়েছো রোজা রেখেছো মানুষ তোমাকে নামাজি রোজাদার বলেছে। কিন্তু নির্জনে ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে হারাম কাজে লিপ্ত থাকতে, আমার ভয় তোমাকে ওসব থেকে ফেরাতে পারেনি, আজ তোমার কোন নেক আমল আমি গ্রহণ করবো না। আমার চাইতে অপমানিত আর কে হবে সেদিন যখন আমার প্রতিটি কর্ম আমার বাবা মা ভাই বোনের সামনে তুলে ধরা হবে। কি করুণ অবস্থা হবে সেদিন আমাদের!

সম্মানিত ভাই ও বোনেরা, এখনো সময় আছে, যে জাহান্নামের আগুন আমরা জ্বালাচ্ছি— অনুতাপের এক ফোঁটা অশ্রু আর আল্লাহর ভয় এই আগুনকে নিভিয়ে দিতে পারে। আমাদের সামনে তো অনুপম আদর্শ হিসেবে সাইয়্যেদুনা ইউসুফ আলাইহিস সালাম রয়েছেন, যখন জুলাইখা নির্জন কক্ষে অবৈধ মেলামেশার আহবান করে তাকে বলেছিল, হাই তালাক। পৃথিবীর আর কোন বাধা তাদের মধ্যে ছিল না, কিন্তু ইউসুফ আ. আল্লাহর ভয়কে পুঁজি করে বলেছিলেন,معاذ الله আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ফলে আল্লাহ তাকে এই ভয়ঙ্কর ফেতনা থেকে পরিত্রান দিয়েছিলেন।

বন্ধু আসুন, আমরা ইন্টারনেটের ভালো দিকগুলোকে গ্রহণ করি,আর নেক আমল ধ্বংসকারী এর নির্জন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমীন, ওয়াসসালামু আলাইকুম রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।